১৫ বছরের লড়াই ও ১০০০ ফুটের গভীরতা: এশিয়ার সর্বোচ্চ চিচাম ব্রিজের নেপথ্যে থাকা অজানা ইতিহাস
ভারতের হিমাচল প্রদেশের লাহুল ও স্পিতি জেলা বরাবরই ইতিহাসের এক রহস্যময় এবং দুর্গম জনপদ হিসেবে পরিচিত। তিব্বতি সংস্কৃতির প্রভাব এবং রুক্ষ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই অঞ্চলটি বছরের অর্ধেক সময় বাকি পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন থাকত।
এই বিচ্ছিন্নতার ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী অধ্যায় হলো চিচাম ব্রিজ (Chicham Bridge)। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৩,২৪৪ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই সেতুটি কেবল স্টিল ও কংক্রিটের কাঠামো নয়, বরং এটি স্পিতির মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই এবং আধুনিক ভারতের প্রকৌশলগত উৎকর্ষের এক জীবন্ত ইতিহাস।
১. ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট ও প্রাচীন বিচ্ছিন্নতা
চিচাম ব্রিজের ইতিহাস বুঝতে হলে আমাদের এই অঞ্চলের ভৌগোলিক গঠন বুঝতে হবে। স্পিতি উপত্যকার ‘কিবার’ এবং ‘চিচাম’ গ্রাম দুটি একে অপরের খুব কাছে অবস্থিত হলেও মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ‘সাম্বা লাম্বা নালা’ (Samba Lamba Nallah) নামক একটি বিশাল এবং গভীর গিরিখাত। এই গিরিখাতটি প্রায় ১০০০ ফুট গভীর। প্রাচীনকাল থেকেই চিচাম গ্রামের মানুষ এক প্রকার দ্বীপবন্দী জীবনযাপন করত।

কিবার গ্রামটি প্রশাসনিক ও ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ হলেও চিচাম ছিল অবহেলিত। ব্রিটিশ শাসন আমল থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত, চিচাম গ্রামের বাসিন্দাদের কিবার বা কাজা শহরে পৌঁছাতে হলে পাহাড়ের দুর্গম খাঁজ বেয়ে ১০-১২ কিলোমিটার নিচে নেমে আবার খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠতে হতো। শীতকালে যখন তুষারপাত শুরু হতো, তখন এই পথটুকু পার হওয়া ছিল আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের সমান।
২. রোপওয়ে যুগ: বিচ্ছিন্নতা ঘোচানোর প্রথম চেষ্টা
১৯৯০-এর দশকের আগে পর্যন্ত চিচাম গ্রামের মানুষের সাথে বাকি দুনিয়ার যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল একটি ম্যানুয়াল ‘রোপওয়ে’ বা ট্রলি। এটি ছিল একটি লোহার ঝুড়ি যা তারের সাহায্যে এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে টেনে নেওয়া হতো।
- বিপদ: এই ট্রলি ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যান্ত্রিক ত্রুটি বা প্রবল বাতাসের কারণে মাঝখাদেই অনেকের প্রাণহানি ঘটেছে।
- সীাবদ্ধতা: ট্রলিতে করে ভারী মালামাল বা অসুস্থ রোগীদের পার করা প্রায় অসম্ভব ছিল। ফলে চিকিৎসার অভাবে অনেক স্থানীয় মানুষকে অকালে প্রাণ হারাতে হয়েছে। এই দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাসই মূলত একটি স্থায়ী সেতুর দাবির জন্ম দেয়।
৩. নির্মাণ পর্ব: ১৫ বছরের এক মহাকাব্য (২০০২ – ২০১৭)
চিচাম ব্রিজের আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা শুরু হয় নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে, তবে প্রকৃত নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০০২-২০০৩ সালের দিকে। এই ১৫ বছরের নির্মাণকাল ভারতের সীমান্ত সড়ক সংস্থা (BRO) এবং হিমাচল প্রদেশ পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্টের (HP PWD) জন্য ছিল এক বিরাট পরীক্ষা।

ক) প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ
হিমালয়ের এই উচ্চতায় কাজ করা সাধারণ সমতলের চেয়ে শতগুণ কঠিন।
- অক্সিজেনের স্বল্পতা: শ্রমিকদের জন্য ১৩,০০০ ফুটের উপরে দীর্ঘক্ষণ কায়িক পরিশ্রম করা ছিল শ্বাসরুদ্ধকর।
- আবহাওয়ার বৈরিতা: বছরে মাত্র ৫ থেকে ৬ মাস এখানে কাজ করা সম্ভব হতো। বাকি সময় এলাকাটি ১০-১৫ ফুট বরফের নিচে ঢাকা থাকত এবং তাপমাত্রা হিমাঙ্কের ৩০ ডিগ্রি নিচে নেমে যেত।
- মেশিনারি ও লজিস্টিকস: ভারী ক্রেন এবং স্টিলের গার্ডারগুলো সরু ও পিচ্ছিল পাহাড়ি পথ দিয়ে স্পটে নিয়ে আসা ছিল এক দুঃসাধ্য কাজ। অনেক সময় পিঠে করে মালামাল বহন করতে হয়েছে।
খ) স্থাপত্যশৈলী
চিচাম ব্রিজটি একটি সাসপেনশন স্টিল গার্ডার ব্রিজ। প্রকৌশলীরা এমন একটি নকশা তৈরি করেন যা হিমালয়ের প্রবল বাতাসের বেগ এবং ভূমিকম্পের কম্পন সহ্য করতে পারে। সেতুর মাঝখানের অংশটি এমনভাবে তৈরি যাতে এটি সামান্য দুললেও ভেঙে না যায়। এর উজ্জ্বল হলুদ রং করা হয়েছিল মূলত কুয়াশা বা তুষারপাতের সময় যাতে অনেক দূর থেকে গাড়িচালকরা এটি দেখতে পায়।
৪. ২০১৭: স্পিতির ইতিহাসে এক নতুন সূর্যোদয়
অবশেষে ১৫ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সালে এই সেতুর উদ্বোধন করা হয়। হিমাচল প্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বীরভদ্র সিং এই সেতুর উদ্বোধন করেন। এটি উদ্বোধনের সাথে সাথে ভারতের লাহুল-স্পিতি অঞ্চলের মানচিত্র বদলে যায়।
- এটি কাজা থেকে লোসার হয়ে মানালি যাওয়ার বিকল্প পথ হিসেবে উন্মুক্ত হয়।
- কাজা শহর থেকে চিচাম গ্রামের দূরত্ব সরাসরি প্রায় ৪০ কিলোমিটার কমে যায়।
- এশিয়ার সর্বোচ্চ মোটরেবল ব্রিজগুলোর তালিকায় এটি শীর্ষস্থান দখল করে।
৫. আর্থ-সামাজিক প্রভাব ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব
ইতিহাস কেবল সাল-তারিখের সমষ্টি নয়, বরং জীবনযাত্রার পরিবর্তন। চিচাম ব্রিজ নির্মাণের ফলে এই অঞ্চলে দুটি প্রধান পরিবর্তন আসে:
- স্বাস্থ্য ও শিক্ষা: সেতুর মাধ্যমে চিচাম গ্রামের শিশুরা কিবার এবং কাজার ভালো স্কুলগুলোতে যাতায়াত শুরু করতে পারে। জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে অ্যাম্বুলেন্স সরাসরি গ্রামে পৌঁছানোর সুযোগ পায়।
- পর্যটন বিপ্লব: এই সেতুটি তৈরির আগে পর্যটকরা মূলত ‘কি মনাস্ট্রি’ বা ‘কিবার’ গ্রাম দেখে ফিরে যেতেন। কিন্তু ব্রিজটি হওয়ার পর ‘চিচাম’ গ্রামটি একটি গ্লোবাল টুরিস্ট স্পটে পরিণত হয়। এর ফলে স্থানীয়দের হোম-স্টে ব্যবসা এবং গাইড হিসেবে আয়ের নতুন উৎস তৈরি হয়।
৬. স্নো লেপার্ড ও বন্যপ্রাণী ইতিহাসের সংযোগ
চিচাম ব্রিজ যে গিরিখাতের ওপর অবস্থিত, সেটি ঐতিহাসিকভাবেই ‘স্নো লেপার্ড’ বা তুষার চিতার বিচরণ ক্ষেত্র। শীতকালে যখন এই এলাকা জনশূন্য হয়ে পড়ে, তখন এই খাদের নিচে এবং ব্রিজের আশেপাশে তুষার চিতাদের শিকার করতে দেখা যায়। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিদদের কাছে এই ব্রিজের নির্মাণ ছিল এক দ্বিমুখী তলোয়ার।

একদিকে যেমন এটি মানুষের সুবিধা করেছে, অন্যদিকে এটি বন্যপ্রাণীদের বিচরণ ক্ষেত্রে মানুষের অনুপ্রবেশ বাড়িয়েছে। তবে বর্তমান স্থানীয় প্রশাসন পরিবেশ রক্ষায় বেশ কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে।
৭. বর্তমান অবস্থা ও পর্যটন গাইড (ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে)
আজ চিচাম ব্রিজ স্পিতি ভ্যালি সার্কিটের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
- ভ্রমণের রুট: আপনি যদি ঐতিহাসিক এই পথে ভ্রমণ করতে চান, তবে শিমলা-কিন্নর রুট দিয়ে আসা উচিত। কারণ এই রুটটি হিন্দুস্তান-তিব্বত রোড (National Highway 5) অনুসরণ করে, যা নিজেই একটি ঐতিহাসিক পথ।
- আশেপাশের পুরাকীর্তি: ব্রিজের কাছেই অবস্থিত কি মনাস্ট্রি (Key Monastery), যা ১১শ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই মঠের প্রাচীন পুথি এবং স্থাপত্যের সাথে চিচাম ব্রিজের আধুনিক প্রকৌশলের তুলনা করলে বোঝা যায় মানুষ কীভাবে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেকে বিবর্তিত করেছে।

৮. কেন এটি ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য গন্তব্য?
ইতিহাসপ্রেমী পর্যটকদের জন্য চিচাম ব্রিজ কেবল ছবি তোলার জায়গা নয়। এটি সেই স্থান যেখানে দাঁড়িয়ে আপনি দেখতে পাবেন:
- আধুনিক মানুষের জেদ যা পাহাড়ের গভীর খাদকে জয় করেছে।
- প্রাচীন তিব্বতি সংস্কৃতির সাথে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার মেলবন্ধন।
- দুর্গম পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষের ১৫ বছরের ধৈর্য ও প্রতীক্ষার ফসল।
চিচাম ব্রিজ হিমাচল প্রদেশের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি যখন প্রয়োজনের সাথে মিলিত হয়, তখন হিমালয়ের মতো বিশাল বাধাও হার মানতে বাধ্য হয়। আপনি যখন এই ব্রিজের মাঝখানে দাঁড়াবেন, তখন কেবল নিচের ১০০০ ফুটের গভীরতা দেখবেন না, বরং অনুভব করবেন সেই ১৫ বছরের শ্রম আর চিচামবাসীর হাজার বছরের বঞ্চনা ঘোচানোর আনন্দ।
তথ্যসূত্র
District Administration, Lahaul & Spiti
Border Roads Organization (BRO) Reports
The Tribune & The Times of India (Archives 2017)
Himachal Pradesh Public Works Department (HP PWD)
