Saturday, February 14, 2026
Homeস্থাপত্য শিল্পবিশ্বের দীর্ঘতম সেতু: ডানয়াং-কুনশান গ্র্যান্ড ব্রিজ

বিশ্বের দীর্ঘতম সেতু: ডানয়াং-কুনশান গ্র্যান্ড ব্রিজ

বিশ্বের দীর্ঘতম সেতু: ডানয়াং-কুনশান গ্র্যান্ড ব্রিজ

একবিংশ শতাব্দীকে বলা হয় চীনের পরিকাঠামো উন্নয়নের যুগ। এই সময়ে চীন এমন কিছু নির্মাণ কাজ হাতে নিয়েছে যা একসময় অসম্ভব বলে মনে করা হতো। তার মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হলো ডানয়াং-কুনশান গ্র্যান্ড ব্রিজ (Danyang–Kunshan Grand Bridge)। এটি কেবল একটি সেতু নয়, এটি চীনের প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার এক বিশাল বিজ্ঞাপন। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুযায়ী এটি বিশ্বের দীর্ঘতম সেতু, যা চীনের জিয়াংসু প্রদেশের পূর্ব প্রান্তকে পশ্চিম প্রান্তের সাথে সংযুক্ত করেছে।

বিশ্বের দীর্ঘতম সেতু কোনটি

বিশ্বের দীর্ঘতম সেতু হলো চীনের ডানয়াং-কুনশান গ্র্যান্ড ব্রিজ (Danyang-Kunshan Grand Bridge)।

বিশ্বের দীর্ঘতম সেতু কোন দেশে অবস্থিত

বিশ্বের দীর্ঘতম সেতু চীনে অবস্থিত।

এশিয়ার দীর্ঘতম সেতু কোনটি

এশিয়ার দীর্ঘতম সেতু হলো চীনের ডানয়াং-কুনশান গ্র্যান্ড ব্রিজ (Danyang-Kunshan Grand Bridge), যা বেইজিং-সাংহাই উচ্চ-গতির রেলপথের অংশ এবং প্রায় ১৬৪.৮ কিলোমিটার (১০২.৪ মাইল) দীর্ঘ, এটি বিশ্বেরও দীর্ঘতম সেতু, যা মূলত একটি রেলওয়ে ভায়াডাক্ট।

১. ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপট

ডানয়াং-কুনশান গ্র্যান্ড ব্রিজ চীনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল জিয়াংসু প্রদেশে অবস্থিত। এটি শুরু হয়েছে নানজিং শহর সংলগ্ন ডানয়াং (Danyang) থেকে এবং শেষ হয়েছে সাংহাইয়ের নিকটবর্তী কুনশান (Kunshan) শহরে। এই সেতুটি মূলত বেইজিং-সাংহাই হাই-স্পিড রেলওয়ে (Beijing–Shanghai High-Speed Railway) প্রকল্পের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

Geographical location and
Photo Source. Wikimedia Commons-Wikimedia.org

এই অঞ্চলটি ইয়াংজি নদী অববাহিকার অন্তর্ভুক্ত। এখানকার ভৌগোলিক গঠন অত্যন্ত জটিল। এলাকাটি মূলত নিচু জমি, জলাভূমি, নদ-নদী এবং বিশাল হ্রদ দ্বারা আবৃত। প্রথাগতভাবে মাটির ওপর দিয়ে রেলপথ নির্মাণ করা এখানে কেবল ব্যয়বহুলই ছিল না, বরং তা পরিবেশ এবং কৃষিজমির জন্য হুমকিস্বরূপ ছিল। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতেই চীন সরকার একটি সুবিশাল উড়াল সেতু বা ভায়াডাক্ট নির্মাণের পরিকল্পনা করে।

২. নির্মাণের ইতিহাস ও সময়সীমা

এই মেগা-প্রজেক্টের পরিকল্পনা করা হয় ২০০০ সালের দশকের মাঝামাঝি সময়ে। চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতিকে সচল রাখতে সাংহাই এবং নানজিংয়ের মতো বড় শহরগুলোর মধ্যে দ্রুত যাতায়াত নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছিল।

  • নির্মাণ শুরু: ২০০৬ সালে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়।
  • নির্মাণকাল: মাত্র ৪ বছর ২ মাস সময় লেগেছে এই ১৬৪.৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণ করতে।
  • উদ্বোধন: ২০১১ সালের ৩০ জুন বেইজিং-সাংহাই হাই-স্পিড রেললাইন খোলার সাথে সাথে এই সেতুটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

এত কম সময়ে ১৬৪ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ একটি সেতু নির্মাণ করা বিশ্বজুড়ে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের কাছে এক বিস্ময়কর ঘটনা হিসেবে পরিচিত।

৩. কারিগরি ও স্থাপত্যশৈলী (Technical Specifications)

সেতুটির স্থাপত্যশৈলী বিশ্লেষণ করলে এর বিশালত্বের ধারণা পাওয়া যায়। এটি একটি ভায়াডাক্ট স্টাইলের সেতু, অর্থাৎ এটি অনেকগুলো ছোট ছোট স্প্যান বা পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি দীর্ঘ পথ।

Technical Specifications 1
Photo Source. From LinkedIn
  • দৈর্ঘ্য: ১৬৪.৮ কিলোমিটার (১০২.৪ মাইল)।
  • গড় উচ্চতা: মাটি থেকে প্রায় ৩১ মিটার বা ১০০ ফুট।
  • স্প্যান সংখ্যা: এই সেতুটিতে প্রায় ৪,৫০০টি কংক্রিটের বক্স-গার্ডার বা স্প্যান ব্যবহার করা হয়েছে।
  • স্তম্ভ বা পিলার: প্রায় ৯,৫০০টিরও বেশি কংক্রিটের পিলার পুরো সেতুটিকে ধারণ করে আছে।

ক) ইয়াংচেং হ্রদের চ্যালেঞ্জ

সেতুটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং চ্যালেঞ্জিং অংশ হলো ইয়াংচেং হ্রদের (Yangcheng Lake) ওপর দিয়ে যাওয়া ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ অংশটি। হ্রদের টালমাটাল পানি এবং নরম মাটির গভীরে পিলার বসানো ছিল চরম ঝুঁকিপূর্ণ। ইঞ্জিনিয়াররা এই অংশে বিশেষ ধরণের স্টিল ও কংক্রিটের মিশ্রণ ব্যবহার করেছেন যাতে পানির স্রোত এবং আর্দ্রতা সেতুর কোনো ক্ষতি করতে না পারে।

খ) কাঁচামাল ও জনবল

এই সেতু নির্মাণে প্রায় ১০,০০০ জন দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার এবং শ্রমিক দিনরাত কাজ করেছেন। এতে ব্যবহৃত স্টিলের পরিমাণ দিয়ে কয়েক ডজন আইফেল টাওয়ার তৈরি করা সম্ভব। এছাড়া লক্ষ লক্ষ টন কংক্রিট এবং সিমেন্ট এই সেতুকে দিয়েছে পাথরের মতো দৃঢ়তা।

৪. স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা

চীন সরকার এই সেতুটি এমনভাবে তৈরি করেছে যাতে এটি অন্তত ১০০ বছর কোনো বড় ধরণের সংস্কার ছাড়াই টিকে থাকতে পারে। এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিচের বিষয়গুলো যুক্ত করা হয়েছে:

ভূমিকম্প প্রতিরোধ: সেতুটি রিখটার স্কেলে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প সহ্য করার ক্ষমতা রাখে। চীনের এই অঞ্চলটি ভূমিকম্পপ্রবণ না হলেও ভবিষ্যতের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে এটি করা হয়েছে।

Danyang Kunshan Grand Bridge Stability and security measures
Photo Source. Unthinkable Build

টাইফুন মোকাবিলা: উপকূলীয় ঝোড়ো হাওয়া বা টাইফুনের গতিবেগ যখন ঘণ্টায় ২০০-৩০০ কিমি ছাড়িয়ে যায়, তখনও এই সেতুটি স্থিতিশীল থাকতে সক্ষম।

নৌযানের ধাক্কা: ইয়াংচেং হ্রদ এবং আশেপাশের নদীগুলোতে বড় বড় জাহাজ চলাচল করে। ভুলবশত কোনো জাহাজ যদি পিলারে ধাক্কা দেয়, তবে ৩ লক্ষ টন ওজনের নৌযানের আঘাত সহ্য করার মতো সক্ষমতা এই পিলারের রয়েছে।

৫. অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও প্রভাব

একটি দেশের অর্থনীতি তার যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। ডানয়াং-কুনশান গ্র্যান্ড ব্রিজ চীনের পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক চেহারা বদলে দিয়েছে।

  • সময় সাশ্রয়: আগে সড়কপথে ডানয়াং থেকে কুনশান যেতে প্রায় ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা সময় লাগত। এই সেতুর ওপর দিয়ে হাই-স্পিড ট্রেন চলাচল করায় এখন সেই দূরত্ব অতিক্রম করতে মাত্র ২ ঘণ্টার কম সময় লাগে।
  • শিল্পায়ন: সুঝৌ, উক্সি এবং চ্যাংঝুর মতো শিল্পশহরগুলো এখন সাংহাই বন্দরের সাথে সরাসরি যুক্ত। এর ফলে পণ্য পরিবহন খরচ কমেছে এবং রপ্তানি বাণিজ্যে গতি এসেছে।
  • জমির অপচয় রোধ: যদি এই ১৬৪ কিমি রাস্তা মাটির ওপর দিয়ে তৈরি করা হতো, তবে প্রায় কয়েক হাজার হেক্টর উর্বর কৃষিজমি নষ্ট হতো। উড়াল সেতু হওয়ায় নিচের জমিতে চাষাবাদ বা অন্যান্য কাজ অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়েছে।

৬. পরিবেশ রক্ষা ও বাস্তুসংস্থান

প্রকৃতির ক্ষতি না করে কীভাবে উন্নয়ন সম্ভব, তার বড় উদাহরণ এই সেতু। জলাভূমি ও নদ-নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ যাতে বিঘ্নিত না হয়, সেভাবেই পিলারের নকশা করা হয়েছে। হ্রদের পানির গুণমান বজায় রাখতে এবং মাছের প্রজনন সচল রাখতে নির্মাণের সময় বিশেষ আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়েছে যাতে শব্দদূষণ ও মাটি দূষণ কম হয়।

৭. গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড এবং বৈশ্বিক স্বীকৃতি

২০১১ সালে এই সেতুটি যখন গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লেখায়, তখন পুরো বিশ্বের নজর চীনের দিকে ঘোরে। এটি এর আগের রেকর্ডধারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘লেক পন্টচার্ট্রেন কজওয়ে’ (৩৮.৪ কিমি) এর চেয়ে চার গুণেরও বেশি বড়। এটি কেবল দৈর্ঘ্যের রেকর্ড নয়, বরং দ্রুততম সময়ে বড় অবকাঠামো তৈরির রেকর্ডও বটে।

৮. পর্যটন আকর্ষণ

যদিও এটি একটি রেলওয়ে ব্রিজ, তবুও পর্যটকদের কাছে এটি একটি বড় আকর্ষণ। সাংহাই থেকে নানজিং যাওয়ার পথে ট্রেনের জানালা দিয়ে যে দৃশ্য দেখা যায়, তা পর্যটকদের মুগ্ধ করে। বিশেষ করে ইয়াংচেং হ্রদের ওপর দিয়ে যখন ট্রেন ৩৫০ কিমি প্রতি ঘণ্টা বেগে ছুটে চলে, তখন মনে হয় ট্রেনের জানলা দিয়ে কোনো সমুদ্র দেখা যাচ্ছে। এই অভিজ্ঞতা নিতেই হাজার হাজার পর্যটক বেইজিং-সাংহাই হাই-স্পিড ট্রেনে ভ্রমণ করেন।

Tourist attractions
Photo Source. From YouTube CGTN Documentary

৯. চীনের অন্যান্য দীর্ঘ সেতুর সাথে তুলনা

বিশ্বের দীর্ঘতম ৫টি সেতুর মধ্যে অধিকাংশই চিনে অবস্থিত। নিচে একটি তুলনামূলক সারণি দেওয়া হলো:

সেতুর নামদেশদৈর্ঘ্য (কিমি)ধরণ
ডানয়াং-কুনশান গ্র্যান্ড ব্রিজচীন১৬৪.৮হাই-স্পিড রেলওয়ে
চাংহুয়া-কাওসিউং ভায়াডাক্টতাইওয়ান১৫৭.৩রেলওয়ে
কাংডে গ্র্যান্ড ব্রিজচীন১১৫.৯রেলওয়ে
তিয়ানজিন গ্র্যান্ড ব্রিজচীন১১৩.৭রেলওয়ে
ওয়েইনান উইহি গ্র্যান্ড ব্রিজচীন৭৯.৭রেলওয়ে

এই সারণি থেকে বোঝা যায় যে, আধুনিক হাই-স্পিড রেল নেটওয়ার্ক নির্মাণে চীন কতটা এগিয়ে রয়েছে।

১০. চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনা

এত বড় প্রজেক্টের পেছনে কেবল প্রশংসাই ছিল না, কিছু সমালোচনাও ছিল। অনেক বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, ৮.৫ বিলিয়ন ডলার খরচ করে এত বড় সেতু নির্মাণের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা কতটা। এছাড়া রক্ষণাবেক্ষণ খরচ নিয়েও অনেকে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তবে গত এক দশকে এই রুটে ট্রেনের যাত্রী সংখ্যা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সমালোচকদের মুখ বন্ধ করে দিয়েছে। চীনের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য এই ধরণের শক্তিশালী পরিকাঠামো এখন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ডানয়াং-কুনশান গ্র্যান্ড ব্রিজ কেবল চীনের সম্পদ নয়, এটি মানবসভ্যতার প্রকৌশলগত সাফল্যের এক উজ্জ্বল স্মারক। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে প্রতিকূল ভৌগোলিক অবস্থানকে জয় করে প্রগতির পথ তৈরি করতে হয়। চীনের এই ‘গ্র্যান্ড ব্রিজ’ আজ বিশ্বের কাছে স্থাপত্যবিদ্যার একটি পাঠ্যপুস্তক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। আধুনিক যুগ যে কেবল গতির নয়, বরং বিশালতাকে জয় করার যুগ—এই সেতু তারই প্রমাণ।

তথ্যসুত্র

China Railway Construction Corporation (CRCC)

Guinness World Records: “Longest bridge (total length)”

Encyclopaedia Britannica: “Danyang-Kunshan Grand Bridge.”

Railway-Technology.com: “Beijing-Shanghai High-Speed Line, China.”

Itihasar Golpo
Itihasar Golpohttps://itihasargolpo.com
Step into the past with our unforgettable historical journey. Discover the secrets of history on our captivating journey.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments