লাহোর গেট: মুঘল সাম্রাজ্যের রাজকীয় প্রবেশদ্বার
লাহোর গেট দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য নিদর্শন, যা মুঘল সাম্রাজ্যের সামরিক, প্রশাসনিক ও নান্দনিক চেতনার প্রতীক। এই গেটটি মূলত দিল্লির ঐতিহাসিক লাল কেল্লা (Red Fort)-এর প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত। লাহোর শহরের দিকে মুখ করে অবস্থিত হওয়ায় এর নামকরণ করা হয় “লাহোর গেট”। শুধু একটি প্রবেশপথ হিসেবেই নয়, বরং এটি মুঘল শাসনব্যবস্থা, রাজকীয় আচার এবং উপমহাদেশের স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক জীবন্ত দলিল।
লাহোর গেটের ইতিহাস
লাল কেল্লা ও লাহোর গেটের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১৭শ শতাব্দীতে মুঘল সম্রাট শাহজাহান তার রাজধানী আগ্রা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৬৩৮ থেকে ১৬৪৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তিনি নির্মাণ করেন লাল কেল্লা, যা তখন “শাহজাহানাবাদ দুর্গ” নামে পরিচিত ছিল।
লাল কেল্লার একাধিক প্রবেশদ্বারের মধ্যে লাহোর গেট ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই গেট দিয়েই রাজদরবার, বিদেশি দূত, সেনাপতি এবং গুরুত্বপূর্ণ অতিথিরা দুর্গে প্রবেশ করতেন। লাহোরের দিকে যাওয়া প্রধান রাজপথের সঙ্গে যুক্ত থাকায় এটি রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকেও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।
নামকরণের কারণ
“লাহোর গেট” নামটি এসেছে এর ভৌগোলিক অবস্থান থেকে। এই গেট দিয়ে বের হলে যে রাজপথটি শুরু হয়, তা সরাসরি পাঞ্জাবের লাহোর শহরের দিকে অগ্রসর হত। মুঘল আমলে দিল্লি ও লাহোর ছিল দুটি প্রধান প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। তাই এই গেট কেবল একটি প্রবেশপথ নয়, বরং দুই মহান নগরের সংযোগস্থল হিসেবেও বিবেচিত হতো।
স্থাপত্যশৈলী ও নকশা
লাহোর গেট মুঘল স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ উদাহরণগুলোর একটি। এর স্থাপত্যে দেখা যায়—
লাল বেলেপাথর (Red Sandstone)-এর ব্যাপক ব্যবহার, সুউচ্চ প্রাচীর ও ভারী কাঠামো, অর্ধবৃত্তাকার খিলান, মিনারসদৃশ অলঙ্কৃত স্তম্ভ, ফুল-লতা ও জ্যামিতিক নকশায় খোদাই, গেটটির উপরের অংশে ছোট ছোট চাতাল ও প্রহরীকক্ষ রয়েছে, যেখানে সৈন্যরা পাহারা দিত। এর দৃঢ় কাঠামো দুর্গের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হলেও নান্দনিক দিক থেকে এটি অত্যন্ত পরিশীলিত।
চট্টা চৌক ও লাহোর গেট
লাহোর গেট দিয়ে প্রবেশ করলেই দেখা যায় ঐতিহাসিক চট্টা চৌক—একটি ছাউনিবিশিষ্ট বাজার। এটি মুঘল আমলে রাজকীয় বাজার হিসেবে ব্যবহৃত হতো, যেখানে মূল্যবান রেশম, মণিমুক্তা, অস্ত্র, সুগন্ধি ও বিদেশি পণ্য বিক্রি হতো। এই বাজারের মধ্য দিয়ে হেঁটে গেলে ধীরে ধীরে দর্শনার্থীরা রাজকীয় পরিবেশে প্রবেশ করতেন—যা ছিল পরিকল্পিত স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
সামরিক ও প্রশাসনিক গুরুত্ব
লাহোর গেট কেবল সৌন্দর্যের জন্য নির্মিত হয়নি। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল দুর্গের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
গেটটি ছিল মোটা দেয়াল ও ভারী কাঠের দরজায় সজ্জিত, শত্রু আক্রমণের সময় এটি দুর্গের প্রথম প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করত, প্রহরীরা এখান থেকেই আগন্তুকদের পর্যবেক্ষণ করত। এছাড়া রাজকীয় আদেশ, সামরিক মিছিল ও উৎসবের সময় এই গেট ছিল প্রধান আনুষ্ঠানিক প্রবেশদ্বার।
ব্রিটিশ আমল ও পরিবর্তন
১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ শাসকরা লাল কেল্লার নিয়ন্ত্রণ নেয়। এই সময় লাহোর গেট ও এর আশপাশের এলাকায় কিছু পরিবর্তন আনা হয়।
গেটের সামরিক গুরুত্ব হ্রাস পায়, দুর্গের অনেক অংশ ব্রিটিশ সেনাদের ব্যারাকে পরিণত হয়, তবুও লাহোর গেট তার ঐতিহাসিক কাঠামো অনেকাংশে অক্ষুণ্ণ রাখে। এই সময় থেকেই লাল কেল্লা ধীরে ধীরে একটি ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভে রূপ নিতে শুরু করে।

আধুনিক ভারতের জাতীয় প্রতীক হিসেবে লাহোর গেট
বর্তমানে লাহোর গেট ভারতের জাতীয় ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। প্রতি বছর ১৫ আগস্ট, ভারতের স্বাধীনতা দিবসে—
প্রধানমন্ত্রী লাহোর গেটের সামনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন, এখান থেকেই জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেওয়া হয়, এই অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচারিত হয় সারা দেশে। এ কারণে লাহোর গেট আজ শুধু মুঘল ঐতিহ্যের নয়, বরং আধুনিক ভারতের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার প্রতীক।
পর্যটন ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
বর্তমানে লাল কেল্লা ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান। লাহোর গেট এর অন্যতম আকর্ষণ।
পর্যটকরা এখানে দেখতে পান—মুঘল স্থাপত্যের সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক প্রহরীকক্ষ, চট্টা চৌকের ঐতিহ্যবাহী বাজার কাঠামো, আলোকসজ্জায় সজ্জিত সন্ধ্যার লাল কেল্লা।লাহোর গেট ইতিহাসপ্রেমী, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য এটি এক অপরিহার্য অধ্যয়ন ক্ষেত্র।
প্রতীকী তাৎপর্য
লাহোর গেট সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানা অর্থ ধারণ করেছে—
মুঘল শক্তি ও রাজকীয়তার প্রতীক, ঔপনিবেশিক ইতিহাসের নীরব সাক্ষী, স্বাধীন ভারতের জাতীয় চেতনার মঞ্চলাহোর গেট। একটি মাত্র গেট হয়েও এটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস বহন করে চলেছে।
লাহোর গেট শুধুমাত্র একটি স্থাপত্য কাঠামো নয়; এটি ইতিহাস, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের এক মিলনস্থল। মুঘল সম্রাট শাহজাহানের দূরদর্শী পরিকল্পনা, ব্রিটিশ শাসনের ছাপ এবং আধুনিক ভারতের স্বাধীনতার প্রতীক—সবকিছু মিলিয়ে লাহোর গেট এক অনন্য ঐতিহাসিক স্মারক।
যে কেউ যদি উপমহাদেশের ইতিহাস, মুঘল স্থাপত্য বা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম বুঝতে চান, তাহলে লাহোর গেট তাদের জন্য এক অপরিহার্য অধ্যয়নের বিষয়।
তথ্যসূত্র
R. Nath, “History of Mughal Architecture”
UNESCO World Heritage Centre, Red Fort Complex, Delhi
ASI – Archaeological Survey of India, Red Fort Complex, Delhi
Government of India – Ministry of Culture, Red Fort and Independence Day Ceremony documents
