Saturday, February 14, 2026
Homeইতিহাস ও ঐতিহ্যআন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস: রক্তে লেখা বর্ণমালা থেকে বিশ্বজয়ের গল্প

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস: রক্তে লেখা বর্ণমালা থেকে বিশ্বজয়ের গল্প

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস: রক্তে লেখা বর্ণমালা থেকে বিশ্বজয়ের গল্প

বাঙালির জাতীয় জীবনে ২১শে ফেব্রুয়ারি একটি অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৫২ সালের এই দিনে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষায় ঢাকার রাজপথে প্রাণ দিয়েছিলেন অকুতোভয় বীর সন্তানেরা। এটি কেবল একটি শোকের দিন নয়, বরং আত্মত্যাগ, সাহসিকতা এবং অধিকার আদায়ের এক দীপ্ত মহিমা। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে এটি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের নিজ নিজ ভাষার অধিকারের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস কি

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হলো ২১শে ফেব্রুয়ারি, যা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে পালিত হয় এবং ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও বহুভাষিকতাকে উৎসাহিত করার জন্য বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত একটি দিন।এটি ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করার পৃথিবীর একমাত্র দৃষ্টান্ত এবং মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভাষাগত ঐতিহ্য রক্ষার একটি প্রতীক।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস কবে

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়।

১. ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক পটভূমি

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ভৌগোলিক দূরত্ব ছাড়াও পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বিস্তর ব্যবধান ছিল। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশের বেশি মানুষের ভাষা ছিল বাংলা, অন্যদিকে শাসকগোষ্ঠীর ভাষা ছিল উর্দু।

ঐতিহাসিক পটভূমি
Photo Source. Vorer Kagoz
  • জিন্নাহর ঘোষণা: ১৯৪৮ সালের ২১শে মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেন, “উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।” এই ঘোষণা বাঙালির মনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
  • ছাত্রদের প্রতিবাদ: জিন্নাহর ঘোষণার পর ছাত্রসমাজ তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানায়। তারা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগানে রাজপথ মুখরিত করে তোলে। এখান থেকেই মূলত ভাষা আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।

২. ১৯৫২ সালের উত্তাল ফেব্রুয়ারি

১৯৫২ সালের শুরুতেই আন্দোলন তীব্রতর হতে থাকে। ৩০শে জানুয়ারি ঢাকার বার লাইব্রেরিতে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

১৯৫২ সালের উত্তাল ফেব্রুয়ারি
Photo Source. Shajgoj
  • ১৪৪ ধারা জারি: আন্দোলনের গতি রোধ করতে পাকিস্তান সরকার ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় সমাবেশ ও মিছিলে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ১৪৪ ধারা জারি করে।
  • ঐতিহাসিক আমতলা সভা: ছাত্ররা সরকারের এই অন্যায় আদেশ মেনে নিতে অস্বীকার করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় (বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণ) ছাত্ররা জমায়েত হন। তারা ঠিক করেন, ১০ জন ১০ জন করে ছোট দলে বিভক্ত হয়ে মিছিল বের করবেন এবং ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবেন।
  • রক্তপাত ও শাহাদাত: মিছিল যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে পৌঁছায়, তখন পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। মুহূর্তের মধ্যেই রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয়। গুলিতে শহীদ হন রফিক উদ্দিন আহমদ, আব্দুল জব্বার এবং আবুল বরকত। পরদিন ২২শে ফেব্রুয়ারি মিছিলে শহীদ হন শফিউর রহমানসহ আরও অনেকে।

৩. শহীদ মিনারের জন্মকথা

২১শে ফেব্রুয়ারির স্মৃতিকে অমর করে রাখতে ২৩শে ফেব্রুয়ারি রাতেই ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা একটি অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন। এটিই ছিল প্রথম ‘শহীদ মিনার’। যদিও ২৫শে ফেব্রুয়ারি পুলিশ এটি গুঁড়িয়ে দেয়, কিন্তু বাঙালির হৃদয়ে যে মিনার তৈরি হয়েছিল, তা আর কেউ মুছে দিতে পারেনি। পরবর্তীতে ১৯৬৩ সালে শিল্পী হামিদুর রহমানের নকশায় বর্তমানের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারটি নির্মিত হয়।

৪. শহীদদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

ভাষা আন্দোলনের শহীদরা আমাদের জাতীয় বীর। তাদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিচে দেওয়া হলো:

শহীদদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
Photo Source. SlideServe
  • রফিক উদ্দিন আহমদ: প্রথম গুলিতে শহীদ হন তিনি। তিনি মানিকগঞ্জের সিংগাইরের সন্তান ছিলেন।
  • আবুল বরকত: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলেন। মিছিলে গুলি লাগলে হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
  • আব্দুল জব্বার: ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা এসেছিলেন অসুস্থ স্ত্রীকে চিকিৎসার জন্য। কিন্তু ভাষার টানে মিছিলে যোগ দিয়ে শহীদ হন।
  • আব্দুস সালাম: তিনি সচিবালয়ের পিয়ন হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মিছিলে অংশ নিয়ে পুলিশের গুলিতে আহত হন এবং পরে হাসপাতালে মারা যান।

৫. রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব

২১শে ফেব্রুয়ারির আন্দোলন শুধু ভাষার লড়াই ছিল না, এটি ছিল বাঙালির স্বাধীনতার প্রথম সোপান।

  • সাংস্কৃতিক জাগরণ: এই আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালির শিল্প-সাহিত্যে এক নতুন জোয়ার আসে। আব্দুল গাফফার চৌধুরীর কালজয়ী গান— “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি”—প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে জায়গা করে নেয়।
  • সংবিধানের স্বীকৃতি: আন্দোলনের মুখে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সরকার বাধ্য হয়ে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়।
  • স্বাধীনতার বীজ: ১৯৫২ সালের সফল আন্দোলন বাঙালিকে স্বাধিকার আন্দোলনের প্রেরণা জোগায়, যা ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পথ প্রশস্ত করে।

৬. আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি

বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন এখন বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি
Photo Source. Jugantor
  • উদ্যোগ: কানাডা প্রবাসী দুই বাঙালি রফিকুল ইসলাম এবং আবদুস সালাম ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য প্রথম জাতিসংঘের কাছে আবেদন জানান। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকারের সক্রিয় প্রচেষ্টায় এটি পূর্ণতা পায়।
  • ইউনেস্কোর ঘোষণা: ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে ১৮৮টি দেশের সমর্থনে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
  • বিশ্বব্যাপী উদযাপন: ২০০০ সাল থেকে বিশ্বের ১৯০টিরও বেশি দেশে দিনটি পালিত হচ্ছে। এটি প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব মাতৃভাষা সংরক্ষণ ও চর্চার বার্তা দেয়।

৭. একুশের চেতনা ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ

বর্তমানে একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপনে আমাদের কিছু বিষয় গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন:

  1. বাংলার শুদ্ধ চর্চা: আমরা যেন শুধু একদিনের আবেগে বাংলাকে সীমাবদ্ধ না রাখি। প্রাত্যহিক জীবন ও দাপ্তরিক কাজে শুদ্ধ বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।
  2. ভাষাদূষণ রোধ: রেডিও, টেলিভিশন এবং বর্তমানের সোশ্যাল মিডিয়ায় বাংলার সঙ্গে ইংরেজি বা অন্য ভাষার বিকৃত সংমিশ্রণ (যাকে ‘বাংলিশ’ বলা হয়) আমাদের ভাষার জন্য হুমকিস্বরূপ।
  3. নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা রক্ষা: বাংলাদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের নিজস্ব মাতৃভাষা হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না। তাদের ভাষার বর্ণমালা ও সাহিত্য টিকিয়ে রাখা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।

৮. তথ্য ও পরিসংখ্যান (একনজরে)

বিশেষ দিনগুরুত্ব ও সংক্ষিপ্ত তথ্য
২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ভাষার দাবিতে চূড়ান্ত রাজপথ আন্দোলন ও রক্তদান।
২৩শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ (ঢাকা মেডিকেল)।
ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান।
১৭ নভেম্বর ১৯৯৯ইউনেস্কো কর্তৃক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ঘোষণা।
২১ ফেব্রুয়ারি ২০০০বিশ্বব্যাপী প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন।

২১শে ফেব্রুয়ারি আমাদের আত্মমর্যাদার প্রতীক। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হয়। একুশ কোনো নির্দিষ্ট সীমায় আবদ্ধ নয়, এটি এখন বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের বিপন্ন ভাষাভাষী মানুষের অনুপ্রেরণা। আমাদের দায়িত্ব হলো এই রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ভাষাকে হৃদয়ে ধারণ করা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম এর সঠিক মর্যাদা পৌঁছে দেওয়া। যে ভাষার জন্য সালাম-বরকতরা প্রাণ দিয়েছেন, সেই ভাষার অপমান বা অবজ্ঞা সহ্য করা কোনো বাঙালির পক্ষেই সম্ভব নয়। একুশ আমাদের শিক্ষা দেয়— ভাষা কেবল কথার মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির আত্মা।

“মোদের গরব মোদের আশা, আমরি বাংলা ভাষা।”

“যতদিন রবে পদ্মা মেঘনা যমুনা গৌরী বহমান, ততদিন রবে বাঙালির জয়গান।”

তথ্যসূত্র

একুশের সংকলন – বাংলা একাডেমি প্রকাশিত বিভিন্ন খণ্ড।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস – বশীর আলহেলাল (বাংলা একাডেমি)।

বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় – জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB)।

বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অফিসিয়াল পোর্টাল

ইউনেস্কো (UNESCO): আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার মূল নথিপত্র (unesco.org)।

Itihasar Golpo
Itihasar Golpohttps://itihasargolpo.com
Step into the past with our unforgettable historical journey. Discover the secrets of history on our captivating journey.
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here


Most Popular

Recent Comments