আর্মেনিয়ান চার্চ: বাংলার বুকে এক প্রাচীন খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যের মহাকাব্য
আর্মেনিয়ান অ্যাপোস্টোলিক চার্চ কেবল একটি উপাসনালয় নয়, এটি বিশ্বের প্রাচীনতম খ্রিস্টীয় সংস্কৃতির ধারক। ককেশাস অঞ্চলের তুষারশুভ্র পর্বতমালা থেকে শুরু করে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বিধৌত বাংলার আর্মানিটোলা পর্যন্ত এই চার্চের ইতিহাস বিস্তৃত। ইতিহাসভিত্তিক কোনো প্ল্যাটফর্মের জন্য এই চার্চের উত্থান, এর স্থাপত্য এবং বিশেষ করে ঢাকার প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব বিশ্লেষণ করা জরুরি।
আর্মেনিয়ান চার্চ কোথায় অবস্থিত
ঐতিহাসিক আর্মেনিয়ান চার্চ (বা আর্মেনিয়ান অ্যাপোস্টলিক চার্চ অফ দ্য হোলি রিজারেকশন) বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় (Armanitola) অবস্থিত। এটি ১৭৮১ সালে নির্মিত হয়েছিল এবং এটি ঢাকার অন্যতম প্রাচীন গির্জা।
১. আর্মেনিয়ান চার্চের আদি ইতিহাস: বিশ্বের প্রথম খ্রিস্টীয় রাষ্ট্র
আর্মেনীয় চার্চের শেকড় প্রোথিত আছে যিশু খ্রিস্টের সরাসরি শিষ্যদের (Apostles) প্রচারণার ওপর। ঐতিহাসিক তথ্যমতে, সেন্ট থাডিউস এবং সেন্ট বার্থোলোমিউ প্রথম শতাব্দীতে আর্মেনিয়ায় খ্রিস্টধর্ম প্রচার করেন।
রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি (৩০১ খ্রিস্টাব্দ): বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে আর্মেনিয়া ৩০১ খ্রিস্টাব্দে খ্রিস্টধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে গ্রহণ করে। রাজা তৃতীয় তিরিডেটস (Tiridates III) সেন্ট গ্রেগরি দ্য ইলুমিনেটরের মাধ্যমে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হন। রোমান সাম্রাজ্যের অনেক আগেই আর্মেনিয়া এই বিপ্লব ঘটিয়েছিল, যা চার্চটিকে ঐতিহাসিকভাবে অনন্য উচ্চতায় বসিয়েছে।

২. আর্মেনীয়দের বাংলায় আগমন: একটি অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন
আর্মেনীয়রা মূলত বণিক জাতি ছিল। পারস্যের সাফাভি সম্রাট শাহ আব্বাস ১৬০৪ সালে কয়েক লাখ আর্মেনীয়কে জুলফা থেকে ইসফাহানে স্থানান্তরিত করেন। সেখান থেকেই তারা ব্যবসার খোঁজে ভারত ও বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে।
কেন তারা বাংলায় এসেছিল? মোগল আমলে বাংলার মসলিন, রেশম, সোরা এবং মশলার বিশ্বজোড়া খ্যাতি ছিল। আর্মেনীয়রা তাদের প্রখর ব্যবসায়িক বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে মোগল দরবারে নিজেদের প্রভাব সৃষ্টি করে। তারা কেবল ব্যবসাই করেনি, বরং বাংলার সমাজ ও স্থাপত্যে এক গভীর ছাপ রেখে যায়। ঢাকার আর্মানিটোলা ছিল তাদের প্রধান বসতি।
৩. ঢাকার হলি রেজারেকশন চার্চ: স্থাপত্য ও নির্মাণ ইতিহাস
পুরান ঢাকার আর্মানিটোলায় অবস্থিত ‘চার্চ অফ দ্য হলি রেজারেকশন’ (Church of the Holy Resurrection) বা ‘আর্মেনিয়ান চার্চ’ ঢাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর একটি।
ক) প্রতিষ্ঠা ও জমিদান
১৭৮১ সালে এই চার্চটি বর্তমান রূপে নির্মিত হয়। এর আগে এখানে একটি ছোট কাঠের চ্যাপেল এবং একটি সমাধিক্ষেত্র ছিল। আগাসাস ক্যাটচিক (Agah Catchick) নামক একজন বিত্তশালী আর্মেনীয় বণিক এই চার্চ নির্মাণের জন্য জমি দান করেন। তাঁরই অর্থায়নে মূল অবকাঠামোটি দাঁড়িয়েছিল।
খ) স্থাপত্যশৈলী
এই চার্চের স্থাপত্যে ইউরোপীয় রেনেসাঁ এবং আর্মেনীয় ঐতিহ্যের এক চমৎকার মিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়:

- আকৃতি: চার্চটি লম্বায় প্রায় ১৫৫ ফুট এবং এর ছাদ অনেক উঁচু। এর অভ্যন্তরে কোনো স্তম্ভ নেই, যা সেই সময়ের প্রকৌশল বিদ্যার এক অনন্য নিদর্শন।
- বেষ্টনী: চার্চের মূল ভবনের চারদিকে সুন্দর বারান্দা রয়েছে, যা গ্রীষ্মমন্ডলীয় আবহাওয়ায় শীতলতা বজায় রাখতে সাহায্য করত।
- ঘণ্টাঘর (Bell Tower): ১৮৩৭ সালে এখানে একটি সুউচ্চ ঘণ্টাঘর নির্মাণ করা হয়েছিল, যা অনেক দূর থেকে দেখা যেত। তবে ১৮৯৭ সালের প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে এটি ভেঙে পড়ে। পরবর্তীতে সেটি আর আগের রূপে মেরামত করা সম্ভব হয়নি।
৪. চার্চের অভ্যন্তর ও সমাধিক্ষেত্র: ইতিহাসের পাথুরে দলিল
আর্মেনিয়ান চার্চের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর বিশাল সমাধিক্ষেত্র। চার্চের আঙিনায় শত শত সমাধি রয়েছে যা পাথর দিয়ে বাঁধানো।
- বিখ্যাত সমাধি: এখানে সবচাইতে পুরনো সমাধিটি ১৭৬২ সালের (চার্চ নির্মাণের আগের)। মার্গারিটা জোহানেসের সমাধিটি এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর স্বামী মাইকেল জোহানেস ১৮৩৭ সালে চার্চের ঘণ্টাঘরটি তাঁর স্মৃতিতে উৎসর্গ করেছিলেন।
- মার্বেল পাথরের কারুকাজ: সমাধিফলকগুলো মূলত ইউরোপ (বিশেষ করে ইটালি) থেকে আনা উন্নত মানের মার্বেল পাথর দিয়ে তৈরি। এই ফলকগুলোতে খোদাই করা লিপি থেকে ঢাকার আর্মেনীয় সমাজের কাঠামো, তাদের পেশা এবং পারিবারিক আভিজাত্যের পরিচয় পাওয়া যায়।
৫. ঢাকার উন্নয়নে আর্মেনীয়দের অবদান ও চার্চের ভূমিকা
আর্মেনীয়রা কেবল চার্চেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ঢাকার আধুনিকায়নে তাদের অবদান অনস্বীকার্য:
- শিক্ষা: অনেক আর্মেনীয় পরিবার ঢাকায় স্কুল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনে অনুদান দিয়েছিলেন।
- নগর পরিকল্পনা: ঘোড়ার গাড়ি বা ‘টিক্কা গাড়ি’ ঢাকায় প্রবর্তন করেছিলেন আর্মেনীয়রাই।
- বাণিজ্য: ঢাকা থেকে পাট ও লবণ রপ্তানিতে তারা পথিকৃৎ ছিলেন। পোগোজ স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা নিকোলাস পোগোজ বা বিখ্যাত ব্যবসায়ী আরটুন স্টিফেন ছিলেন এই চার্চেরই সদস্য।
৬. চার্চের বর্তমান অবস্থা ও সংরক্ষণ চ্যালেঞ্জ
১৯ শতকের শেষের দিকে আর্মেনীয়রা ধীরে ধীরে ঢাকা ছাড়তে শুরু করে। বর্তমানে ঢাকায় কোনো স্থায়ী আর্মেনীয় পরিবার নেই। তবে চার্চটি আজও সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে।
- আর্মেনীয় ট্রাস্ট: চার্চের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে একটি ট্রাস্ট। মাইকেল জোসেফ মার্টিন ছিলেন ঢাকার শেষ সক্রিয় আর্মেনীয়, যিনি দীর্ঘকাল এই চার্চের দেখাশোনা করেছেন। ২০২০ সালে তার মৃত্যুর পর চার্চটি এখন মূলত একটি ঐতিহাসিক জাদুঘর ও সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে।
- মাদার তেরেসার সফর: ১৯৯৬ সালে মাদার তেরেসা চার্চটি পরিদর্শন করেন এবং চার্চের প্রাঙ্গণে অবস্থিত আবাসে কয়েকদিন অবস্থান করেন। এটি এই স্থানটির মর্যাদা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

৭. ঐতিহাসিক পর্যটন ও গুরুত্ব
ইতিহাসবিদদের মতে, আর্মেনিয়ান চার্চ হলো ঢাকার কসমোপলিটান বা বহুসাংস্কৃতিক ইতিহাসের জীবন্ত প্রমাণ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ঢাকা একসময় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের মিলনমেলা ছিল। পর্যটক এবং গবেষকদের জন্য এই চার্চটি স্থাপত্যশৈলী, এপিগ্রাফি (শিলালিপি) এবং মোগল-পরবর্তী সামাজিক বিবর্তনের পাঠশালা।
আর্মেনিয়ান চার্চের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব
| নাম | পরিচয়/পদবি | চার্চ ও ঢাকার ইতিহাসে অবদান |
| আগাসাস ক্যাটচিক (Agah Catchick) | ধনাঢ্য বণিক ও দানবীর | তিনি চার্চের বর্তমান জায়গাটি দান করেন এবং ১৭৮১ সালে চার্চটি নির্মাণে প্রধান অর্থায়ন করেন। |
| মাইকেল জোহানেস (Michael Johannes) | ব্যবসায়ী | ১৮৩৭ সালে তিনি চার্চের আঙিনায় একটি বিশাল ঘণ্টাঘর (Bell Tower) নির্মাণ করেন, যা তাঁর প্রয়াত স্ত্রীর স্মৃতিতে উৎসর্গ করা হয়েছিল। |
| মার্গারিটা জোহানেস (Margarita Johannes) | চার্চের সদস্য | তাঁর সমাধিটি চার্চের প্রাঙ্গণে অবস্থিত সবচেয়ে সুন্দর এবং ঐতিহাসিক সমাধিফলকগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত। |
| নিকোলাস পোগোজ (Nicholas Pogose) | শিক্ষানুরাগী ও জমিদার | তিনি ঢাকার বিখ্যাত ‘পোগোজ স্কুল’ এর প্রতিষ্ঠাতা এবং আর্মেনীয় সম্প্রদায়ের একজন প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। |
| আর্টুন স্টিফেন (Aratoon Stephen) | শিল্পপতি | তিনি কলকাতার গ্র্যান্ড হোটেল এবং ঢাকার আবাসন ব্যবসায় বিখ্যাত ছিলেন; চার্চের উন্নয়নে তাঁর অনেক দান রয়েছে। |
| মাইকেল জোসেফ মার্টিন (Michael Joseph Martin) | চার্চের শেষ তত্ত্বাবধায়ক | তিনি ছিলেন ঢাকার শেষ স্থায়ী আর্মেনীয় নাগরিক। ২০২০ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই চার্চটি পরম মমতায় আগলে রেখেছিলেন। |
| মাদার তেরেসা (Mother Teresa) | নোবেলজয়ী মানবতাবাদী | ১৯৯৬ সালে ঢাকা সফরের সময় তিনি এই চার্চে অবস্থান করেছিলেন, যা চার্চের ইতিহাসে একটি ধর্মীয় মাইলফলক। |
আর্মেনিয়ান চার্চ কেবল ইট-পাথরের কোনো প্রাচীন ইমারত নয়, বরং এটি ঢাকার বহুমাত্রিক ও বিশ্বজনীন ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। যে সময়ে ঢাকা বিশ্ববাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছিল, সেই সময়ে দূর পরবাস থেকে আসা একদল উদ্যমী মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আত্মপরিচয় টিকিয়ে রাখার সংগ্রামের প্রতীক এই গির্জা।
আজ হয়তো আর্মানিটোলার রাস্তায় সেই চেনা আর্মেনীয় বণিকদের পদচারণা নেই, কিন্তু চার্চের নিস্তব্ধ আঙিনা এবং ল্যাটিন ও আর্মেনীয় ভাষায় খোদাই করা সমাধিফলকগুলো আজও তাদের গৌরবোজ্জ্বল অতীতের কথা জানান দেয়।
এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই শহরটি একসময় ভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষকে পরম মমতায় আপন করে নিয়েছিল। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই স্থাপত্যটি কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, বরং এটি আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং সমৃদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের এক অমূল্য অংশ।
তাই এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব, যাতে আগামীর গবেষক ও ইতিহাসপ্রেমীরা বাংলার মাটির সাথে বহির্বিশ্বের এই সুপ্রাচীন সেতুবন্ধনের শেকড় খুঁজে পেতে পারেন।
তথ্যসূত্র
আর্মানিটোলা চার্চের শিলালিপি ও নথি।
বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রেকর্ড।
Meskrob Jacob Seth এর লেখা “Armenians in India”।
