বেইপানজিয়াং সেতু: বিশ্বের সর্বোচ্চ সেতুর নির্মাণশৈলী, ইতিহাস ও গুরুত্ব
আধুনিক সভ্যতার ইতিহাসে প্রকৌশলবিদ্যার জয়গান যখনই গাওয়া হয়, চীনের নাম সেখানে অবধারিতভাবে চলে আসে। তবে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের পার্বত্য অঞ্চলে বেইপান নদীর ওপর নির্মিত বেইপানজিয়াং সেতু (Beipanjiang Bridge) কেবল একটি সেতু নয়, এটি মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক মূর্ত প্রতীক।
৫৬৫ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই সেতুটি বর্তমানে বিশ্বের সর্বোচ্চ সেতু (Highest Bridge) হিসেবে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নিজের নাম খোদাই করে নিয়েছে। এই সেতুটি আধুনিক বিশ্বের একটি বিস্ময়, যা একটি অঞ্চলের ভাগ্য বদলে দিয়েছে।
১. ভৌগোলিক অবস্থান ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বেইপানজিয়াং সেতুটি চীনের গুইঝু (Guizhou) এবং ইউনান (Yunnan) প্রদেশের সীমান্তে অবস্থিত। এই অঞ্চলটি ভৌগোলিক দিক থেকে অত্যন্ত দুর্গম। চারদিকে খাড়া পাহাড়, গভীর গিরিখাত এবং নিচে খরস্রোতা বেইপান নদী।
সেতুটি নির্মাণের আগে এই দুই প্রদেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে গিরিখাতের নিচে নামতে হতো, তারপর ছোট নৌকায় নদী পার হয়ে আবার পাহাড় চড়তে হতো। সামান্য কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগত ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা।
বর্ষাকালে নদী যখন উত্তাল হয়ে উঠত, তখন এই যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। এই বিচ্ছিন্নতা ঘোচাতে এবং চীনের ‘জি৫৬ হাংঝু-রুইলি এক্সপ্রেসওয়ে’ সফল করতে এই সেতুটি ছিল অপরিহার্য।
২. স্থাপত্যশৈলী এবং নকশার গভীর বিশ্লেষণ
বেইপানজিয়াং সেতুটি একটি ক্যাবল-স্টেড (Cable-stayed) ডিজাইনের সেতু। এর মানে হলো, সেতুর মূল পাটাতন বা রাস্তাটি বিশাল বিশাল স্টিলের তারের মাধ্যমে পিলারের সাথে ঝুলে থাকে।

ক) বিস্ময়কর উচ্চতা
এর উচ্চতা ৫৬৫ মিটার (১৮৫৪ ফুট)। তুলনা করলে দেখা যায়, এটি ফ্রান্সের আইফেল টাওয়ারের চেয়েও প্রায় দ্বিগুণ উঁচু। আপনি যদি সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকান, তবে নিচের বিশাল নদীটিকে একটি সরু সুতার মতো মনে হবে।
খ) স্প্যান এবং টাওয়ার
সেতুটির মোট দৈর্ঘ্য ১,৩৪১.৪ মিটার। এর মূল স্প্যান বা দুটি পিলারের মধ্যবর্তী দূরত্ব ৭২০ মিটার। সেতুর পূর্ব দিকে গুইঝু প্রান্তে টাওয়ারটির উচ্চতা ২৬৯ মিটার এবং পশ্চিম দিকে ইউনান প্রান্তের টাওয়ারটি ২৪৭ মিটার। উচ্চতার এই তারতম্য করা হয়েছে পাহাড়ের ঢাল এবং ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে।
৩. নির্মাণকালীন অভাবনীয় চ্যালেঞ্জসমূহ
এত উঁচুতে একটি মেগা-স্ট্রাকচার তৈরি করা ছিল এক প্রকার অসম্ভব কাজ। প্রকৌশলীরা বেশ কিছু প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছিলেন:
প্রবল বাতাসের চাপ
৫০০ মিটারের বেশি উচ্চতায় বাতাসের গতিবেগ সমতলের চেয়ে অনেক বেশি থাকে। তীব্র বাতাসের ঝাপটায় সেতুর তার বা পাটাতন যেন দুলে না ওঠে, সেজন্য এর অ্যারোডাইনামিক ডিজাইন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে করা হয়েছে। উচ্চপ্রযুক্তির উইন্ড-টানেল টেস্টের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে যে এটি প্রচণ্ড ঝড়ো হওয়াতেও স্থির থাকবে।
দুর্গম ভূখণ্ডে লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ
পাহাড়ের চূড়ায় যেখানে সাধারণ ট্রাক পৌঁছানো অসম্ভব, সেখানে হাজার হাজার টন স্টিল এবং সিমেন্ট নিয়ে যাওয়া ছিল এক বিশাল যুদ্ধ। এজন্য বিশেষ ধরনের ক্যাবল ক্রেন ব্যবহার করা হয়েছিল। পিলারের জন্য গভীর গর্ত খুঁড়তে গিয়ে দেখা গেছে পাহাড়ের ভেতরে প্রকাণ্ড সব প্রাকৃতিক গুহা রয়েছে, যা পিলারের স্থায়িত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছিল। ইঞ্জিনিয়াররা তখন সিমেন্টের বিশেষ মিশ্রণ দিয়ে সেই গুহাগুলো ভরাট করে ভিত শক্ত করেন।

গাণিতিক নির্ভুলতা
সেতুটির নির্মাণ কাজ দুই দিক থেকে শুরু হয়ে মাঝখানে এসে মিলেছে। যখন দুই পাশের অংশগুলো জোড়া লাগানো হয়, তখন দেখা যায় তাদের মধ্যে ব্যবধান ছিল মাত্র ০.৩ মিলিমিটার! এই পর্যায়ের নিখুঁত কাজ আধুনিক সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ইতিহাসে বিরল।
৪. অর্থনৈতিক প্রভাব: একটি অঞ্চলের ভাগ্য বদল
একটি সেতু কীভাবে লাখ লাখ মানুষের জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন আনতে পারে, তার আদর্শ উদাহরণ বেইপানজিয়াং।
পরিবহন বিপ্লব: আগে যেখানে ৫ ঘণ্টা সময় লাগত, এখন সেখানে মাত্র ১ ঘণ্টায় যাতায়াত করা যায়। এর ফলে দ্রুত পচনশীল কৃষিপণ্য যেমন শাকসবজি ও ফলমূল খুব সহজেই বড় শহরগুলোর বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে।
শিল্পায়ন: যাতায়াত সহজ হওয়ায় গুইঝু এবং ইউনান প্রদেশে নতুন নতুন কলকারখানা স্থাপিত হচ্ছে। স্থানীয় খনিজ সম্পদ পরিবহন এখন আগের চেয়ে অনেক সস্তা।
কর্মসংস্থান: এই এক্সপ্রেসওয়ের কারণে স্থানীয় কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। ট্রান্সপোর্ট সেক্টরে এক বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে।
৫. পর্যটন শিল্পে নতুন দিগন্ত
বেইপানজিয়াং সেতুটি এখন কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, এটি একটি গ্লোবাল টুরিস্ট স্পট।
- মেঘের রাজ্যে ভ্রমণ: কুয়াশার দিনে যখন মেঘগুলো সেতুর নিচে বা সমান উচ্চতায় খেলা করে, তখন পর্যটকদের মনে হয় তারা শূন্যে ভাসছেন। এই দৃশ্য দেখার জন্য প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ এখানে ভিড় করেন।
- ফটোগ্রাফি: ড্রোন ফটোগ্রাফারদের জন্য এটি বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় জায়গা। পাহাড়ের সবুজ আর কুয়াশার মাঝে লালচে-ধূসর সেতুটির দৃশ্য এক অপার্থিব সৌন্দর্যের জন্ম দেয়।

৬. কারিগরি তথ্যের একনজরে তালিকা
| বৈশিষ্ট্য | বিস্তারিত তথ্য |
| অফিসিয়াল নাম | ডুগু বেইপানজিয়াং সেতু (Duge Beipanjiang Bridge) |
| বিশ্ব রেকর্ড | বিশ্বের সর্বোচ্চ সেতু (নদী থেকে উচ্চতার হিসেবে) |
| মোট উচ্চতা | ৫৬৫ মিটার / ১,৮৫৪ ফুট |
| মোট দৈর্ঘ্য | ১,৩৪১.৪ মিটার / ৪,৪০০ ফুট |
| প্রধান স্প্যান | ৭২০ মিটার / ২,৩৬০ ফুট |
| নির্মাণ শুরু | ২০১৩ সাল |
| উদ্বোধন | ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৬ |
| নির্মাণ ব্যয় | ১.০৩ বিলিয়ন ইউয়ান (প্রায় ১৫ কোটি ডলার) |
| লেন সংখ্যা | ৪ লেনের এক্সপ্রেসওয়ে |
৭. বেইপানজিয়াং বনাম বিশ্বের অন্যান্য মেগা সেতু
অনেকেই চীনের এই সেতুটিকে ফ্রান্সের মিলো ভায়াডাক্ট (Millau Viaduct) এর সাথে তুলনা করেন। তবে দুটির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে:
- কাঠামোগত উচ্চতা (Tallest): মিলো ভায়াডাক্টের পিলারগুলো ভূমি থেকে ৩৪৩ মিটার উঁচু, যা আইফেল টাওয়ারের চেয়েও বেশি। কাঠামোগত উচ্চতার দিক থেকে এটিই বিশ্বের সেরা।
- নদী থেকে উচ্চতা (Highest): কিন্তু বেইপানজিয়াং সেতুর রাস্তাটি মাটি বা নদী থেকে ৫৬৫ মিটার উপরে। অর্থাৎ উচ্চতার নিরিখে বেইপানজিয়াং অনেক এগিয়ে।
এছাড়া চীনের সিডু রিভার ব্রিজ (Sidu River Bridge) এক সময় সর্বোচ্চ ছিল (৪৯৬ মিটার), যাকে বেইপানজিয়াং ২০১৬ সালে পেছনে ফেলে দেয়।

৮. রক্ষণাবেক্ষণ এবং সুরক্ষা ব্যবস্থা
এত বড় এবং উঁচু একটি স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত জটিল।
- সেন্সর প্রযুক্তি: সেতুর প্রতিটি ক্যাবল এবং পিলারে শত শত সেন্সর বসানো আছে। এগুলো প্রতি মুহূর্তে বাতাসের গতি, সেতুর কম্পন এবং স্টিলের টেনশন পর্যবেক্ষণ করে। কোনো অসামঞ্জস্য দেখা দিলে সাথে সাথে কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুমে সংকেত পৌঁছে যায়।
- মরিচারোধক ব্যবস্থা: পাহাড়ের আর্দ্রতা থেকে রক্ষা পেতে সেতুতে বিশেষ ধরনের কোটিং বা প্রলেপ ব্যবহার করা হয়েছে যেন স্টিলের তারগুলোতে মরিচা না ধরে।
৯. প্রকৌশলীদের বার্তা: অসম্ভব কিছু নয়
বেইপানজিয়াং সেতুর প্রধান প্রকৌশলী ঝু ঝংহুয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আমাদের লক্ষ্য ছিল প্রকৃতির সাথে লড়াই করা নয়, বরং প্রকৃতির মাঝে মানুষের জন্য পথ তৈরি করা।” এই সেতুটি প্রমাণ করে যে, যদি বিজ্ঞান এবং মেধার সঠিক সমন্বয় ঘটে, তবে পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর গিরিখাতকেও জয় করা সম্ভব।
বেইপানজিয়াং সেতু আধুনিক বিজ্ঞানের একটি মহাকাব্য। এটি চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ। যারা ভ্রমণ পছন্দ করেন এবং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভক্ত, তাদের জন্য এই সেতুটি একবার হলেও দেখা উচিত। এটি কেবল একটি কংক্রিটের কাঠামো নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি অনুপ্রেরণা—যা মেঘের রাজ্যে মানুষের বিজয় কেতন উড়িয়ে চলেছে।
তথ্যসূত্র
HighestBridges.com
Xinhua News Agency
Guinness World Records
CGTN (China Global Television Network)
ASCE (American Society of Civil Engineers)
